সোমবার, ৩০ জুন, ২০১৪

আর্কিমিডিসঃ গণিতের এক অসাধারণ কারিগর

আর্কিমিডিস(খ্রি.পূ. ২৮৭-২১২) আনুমানিক ২৮৭ খৃস্টপূর্বাব্দে তৎকালীন বৃহত্তর গ্রিসের উপনিবেশ সিসিলি দ্বীপের সিরাকিউজ নামের বন্দর নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাইজান্টাইন গ্রিক ঐতিহাসিক জন যেতজেসের বিবরণ অনুযায়ী আর্কিমিডিস পঁচাত্তর বছর বয়সে মারা যান, সেখান থেকে তাঁর জন্মসাল সম্পর্কে ধারণা করা হয়। দ্য স্যান্ড রেকোনার নামক দলিলে আর্কিমিডিস তাঁর বাবার নাম ফিডিয়াস বলে উল্লেখ করেন। ফিডিয়াস একজন জ্যোতির্বিদ ছিলেন। ঐতিহাসিক প্লুটার্খ তাঁর দ্য প্যারালাল লাইভসনামক জীবনী গ্রন্থে আর্কিমিডিসকে সিরাকিউজের রাজা দ্বিতীয় হিয়েরোর আত্মীয় বলে উল্লেখ করেন।


আর্কিমিডিস তার অনিয়মিত আকারের বস্তুর আয়তন পরিমাপের পদ্ধতির মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে মুকুটের সোনার ঘনত্ব খাটি সোনার ঘনত্বের চেয়ে কম।
আর্কিমিডিসের সবচেয়ে জনপ্রিয় আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি ছিল অনিয়মিত আকারের বস্তুর আয়তন পরিমাপের পদ্ধতি। ভিট্রুভিয়াসের বিবরণ অনুযায়ী, রাজা দ্বিতীয় হিয়েরোর জন্য লরেল পাতার মুকুটের মত দেখতে একটি সোনার মুকুট প্রস্তুত করা হয়েছিল। আর্কিমিডিসকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মুকুটটি খাঁটি সোনার কিনা সেটা নিশ্চিত করার। সহজ পদ্ধতি ছিল মুকুটটি গলিয়ে তার ঘনত্ব নির্ণয় করা, কিন্তু রাজা মুকুটটি নষ্ট করতে রাজি ছিলেন না। আর্কিমিডিস যখন এ সমস্যা নিয়ে ভাবছিলেন, তখন হঠাৎ গোসল করতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন যে তিনি পানিতে নামা মাত্রে বাথটাবের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারেন যে পানির এই ধর্মকে ঘনত্ব পরিমাপে ব্যবহার করা সম্ভব। যেহেতু ব্যবহারিক কাজের জন্য পানি অসংকোচনশীল, তাই পানিতে নিমজ্জিত মুকুট তার আয়তনের সমান পরিমাণ পানি স্থানচ্যুত করবে। এই অপসারিত পানির আয়তন দ্বারা মুকুটের ভরকে ভাগ করে মুকুটের ঘনত্ব পরিমাপ করা সম্ভব। যদি মুকুটের উপাদানে সোনার সাথে অন্য কোন কম ঘনত্বের সস্তা ধাতু যোগ করা হয় তাহলে তার ঘনত্ব খাঁটি সোনার ঘনত্বের চেয়ে কম হবে। বলা হয়ে থাকে যে এই আবিষ্কার আর্কিমিডিসকে এতই উত্তেজিত করেছিল যে তিনি নগ্ন অবস্থায় শহরের রাস্তায় “ইউরেকা” (গ্রিক: “εὕρηκα!” ; অর্থ “আমি পেয়েছি!”) বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়াতে শুরু করেছিলেন।
বাস্তবে আর্কিমিডিসের আবিষ্কৃত এই পদ্ধতিটি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিল, কারণ ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে যে পরিমাণ পানি অপসারিত হবে সেটি সঠিকভাবে নির্নয় করা একটি কষ্টসাধ্য কাজ। এই সমস্যার সমাধান করা হয় হয় fluid statics এর মাধ্যমে যেটি আর্কিমিডিস তত্ত্ব নামে পরিচিত। তত্ত্বটি তার On Floating Bodies প্রবন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে। তত্ত্বে বলা হয়েছে যে , কোন বস্তুর ওজন এটি দ্বারা অপসারিত পানির ওজনের সমান।
গণিত
যদিও আর্কিমিডিসকে বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কারের জন্য সবচেয়ে বেশি মনে রাখা হয়, কিন্তু তিনি গণিতেও অনেক অবদান রাখেন। প্লুটার্খ লিখেছেন, “তাঁর সমুদয় ভালোবাসা এবং উচ্চাকাঙ্খা ছিল সেসব তাত্ত্বিক বিষয়ের প্রতি যেখানে তাঁকে বাস্তব জীবনের প্রয়োজন নিয়ে মাথা ঘামাতে হতো না।”

আর্কিমিডিস মেথড অভ এক্সহশন ব্যবহার করে পাইয়ের আসন্ন মান নির্ণয় করেন

আর্কিমিডিস সম্পর্কে আরও জানতে - আর্কিমিডিস

এভারিস্ট গ্যালোয়া -এক রাতের গণিতবিদ

আজ তোমাদের এমন একজন গণিতবিদের কথা বলব যার জীবনটি এত বিচিত্র যে কোনো গল্প উপন্যাস বা নাটকেও সে রকম বিচিত্র জীবন খুঁজে পাওয়া যাবে না। রূপকথার রাজপুত্রের মতো সেই প্রায় কিশোর গণিতবিদ প্রথমবার গণিতের সাথে পরিচয় হয় যখন তার বয়স ষোল এবং তার মৃত্যুর হয় যখন তার বয়স কুড়ি এবং গণিতের ওপর তার পুরো কাজগুলো লিখে রাখে মাত্র এক রাতে এবং তারপরও গণিতের জগৎ তাকে স্মরণ করে গভীর ভালোবাসায় এবং শ্রদ্ধায়।এই গণিতবিদের নাম এভারিস্ট গ্যালোয়া।
          
গণিতের সাথে গ্যালোয়ার পরিচয় হয়েছে ষোলো বছর বয়সে এবং সতেরো বছর বয়সে গণিতের জার্নালে তার প্রথম গবেষণাপত্র ছাপা হলো। সে ইকল পলিটেকনিক নামে দেশের সবচেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করলো।বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য মৌখিক পরীক্ষা দিতে হবে। তাকে যে প্রশ্ন করা হলো তার উত্তরগুলো সে দিল খুব সংক্ষেপে- উপস্থিত যারা ছিল তারা সেগুলো বুঝতেই পারল না। কাজেই একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার ঘটে গেল, গ্যালোয়া ভর্তিই হতে পারল না।
তার আগ্রহ ছিল ত্রিঘাত, চতুর্ঘাত বা পঞ্চঘাত সমীকরণে। গ্যালোয়া অনেক খাটাখাটুনি করে দুটি রিসার্চ পেপার তৈরি করে সেগুলো একাডেমি অব সায়েন্সে জমা দিল। কিন্ত রাজনৈতিক কারণে গ্যালোয়ার গবেষণা গায়েব হয়ে যায়।
স্টেফানি ফেলিসি নামে প্যারিসের একজন খ্যাতনামা ডাক্তারের মেয়ের সাথে গ্যালোয়ার গভীর ভালোবাসা হয়েছে। মেয়ের বাবা পাসচু দরবনভিল এই ঘটনায় খুব রেগে গেলেন। অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে শুটিং ডুয়েলের চ্যালেঞ্জ দেন গ্যালোয়াকে ।ডুয়েলের আগের রাতে গ্যালোয়া হঠাৎ করেই বুঝতে পারল হয়তো এই রাতটিই তার জীবনের শেষ রাত।গ্যালোয়া রাত জেগে তার থিওরেমগুলো লিখতে শুরু করল। পরদিন নিষ্ঠুর পাসচুর দক্ষ হাতের গুলিতে গ্যালোয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। মাত্র বিশ বছর বয়সে সর্বকালের একজন শ্রেষ্ঠ গণিতবিদের বিচিত্র জীবনের ইতি হলো এভাবে।
তারপর দীর্ঘ দশ বছর কেটে গিয়েছে। গ্যালোয়ার জীবনের শেষ রাতে লেখা কাগজগুলো তার বন্ধু ইউরোপের বড় বড় গণিতবিদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল কিন্তু কেউ সেটা নিয়ে মাথা ঘামাননি। অস্থির গ্যালোয়ার বিচ্ছিন্ন সামঞ্জস্যহীন লেখা থেকে তার প্রকৃত মর্মোদ্ধার করা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না।
কাগজগুলোর একটা কপি শেষ পর্যন্ত জোসেফ লিউভিলের কাছে পৌঁছাল, এই মেধাবী গণিতবিদ সেই কাগজগুলো থেকে তার প্রকৃত তথ্যগুলো বের করলেন। গ্যালোয়ার খাপছাড়া বিচ্ছিন্ন লেখাগুলো থেকে মর্মোদ্ধার করে সেগুলো তিনি দেশের সবচেয়ে সম্মানিত জার্নালে প্রকাশ করতে শুরু করলেন। পৃথিবীর গণিতবিদরা তখন সবিস্ময়ে এই তরুণ গণিতবিদের বিস্ময়কর আবিষ্কারের সাথে প্রথমবার পরিচিত হলেন। গভীর শ্রদ্ধায় এবং ভালোবাসায় তাদের মাথা নত হয়ে এলো।
এক রাতের গণিতবিদন পৃথিবীর মানুষের স্বীকৃতি এবং ভালোবাসা পেলেন, কিন্তু বড় দেরি করে।

রবিবার, ২৯ জুন, ২০১৪

লিওনার্ট অয়লারঃ সর্বকালের সেরা গণিতবিদ

লিওনার্ট অয়লার (1701-1783)একজন সুইস গণিতবিদ এবং পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি ক্যালকুলাস, সংখ্যাতত্ত্ব, অন্তরক সমীকরণ, গ্রাফ তত্ত্ব ও টপোগণিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আধুনিক গণিতে ব্যবহৃত অনেক পরিভাষা ও ধারণা তাঁর অবদান। গাণিতিক বিশ্লেষণে ব্যবহৃত গাণিতিক ফাংশন-এর ধারণা তাঁরই আবিষ্কার। অয়লার e , পাই এর জন্য π , যোগের জন্য Σ চিহ্নের প্রবর্তন করেন। তিনি বলবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানেও অবদান রাখেন।


তিনি প্রথম ফাংশনের ধারণা প্রচলন করেন এবং f(x) চিহ্ন দ্বারা f কে x এর ফাংশন রূপে প্রকাশ করেন। তিনি ত্রিকোণমিতিক ফাংশন প্রকাশের আধুনিক রীতিটিরও প্রচলন করেন, e দ্বারা স্বাভাবিক লগারিদমের ভিত্তি (যা বর্তমানে অয়লারের সংখ্যা হিসাবেও পরিচিত), গ্রিক বর্ণ Σ দ্বারা যোগফল এবং i দ্বারা কাল্পনিক সংখ্যা প্রকাশের প্রচলন করেন।
অয়লার বিশ্লেষণী পদ্ধতির ব্যবহারের মাধ্যমে সংখ্যাতাত্তিক সমস্যা সমাধানের পথ দেখান। এর মাধ্যমে তিনি গণিতের দু’টি ভিন্ন শাখা একত্রিত করেন এবং বিশ্লেষণী সংখ্যা তত্ত্ব নামক একটি নতুন শাখার সূচনা করেন। এ নতুন শাখাটির ভিত্তি তৈরি করবার সময় অয়লার অধিজ্যামিতিক ধারা, q-ধারা, অধিবৃত্তীয় ত্রিকোণমিতিক ধারা এবং অবিরত ভগ্নাংশের বিশ্লেষণী তত্ত্বের সূচনা করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মৌলিক সংখ্যার অসীমতা প্রমাণ করেন হারমনিক ধারার অপসারিতা ব্যবহার করে, এবং তিনি মৌলিক সংখ্যার বণ্টন অনুধাবনের লক্ষ্যে বিশ্লেষণী পদ্ধতি ব্যবহার করেন। অয়লারের এ কাজের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে মৌলিক সংখ্যা তত্ত্ব।
১৯৮৮ সালেম্যাথেমেটিকাল ইনটেলিজেন্সারের পাঠকেরা এটিকে “সর্বকালের সবচেয়ে সুন্দর গাণিতিক সমীকরণ” হিসাবে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করে। অয়লার সেই নির্বাচনের সেরা পাঁচটি সমীকরণের তিনটির সাথেই যুক্ত ছিলেন।